গল্পটা ওহিদুল মোল্লার: রিকশাচালক থেকে ‘হ্যাকিং গুরু’
![]() |
| গল্পটা ওহিদুল মোল্লার: রিকশাচালক থেকে ‘হ্যাকিং গুরু’ |
গল্পটা ওহিদুল মোল্লার: রিকশাচালক থেকে ‘হ্যাকিং গুরু’
স্পেশাল রিপোর্টার: নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের মোহরকয়া গ্রামের কৃষক মৃত রব্বেল মোল্লার ছেলে ওহিদুল মোল্লা। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার হেফজ খানায় তার লেখাপড়ার পাঠ শুরু হয়। কিন্তু হেফজ শেষ না করেই মাদ্রাসা থেকে পালান তিনি। পড়াশোনার পাঠ এখানেই শেষ। পরে কাজ শুরু করেন রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে। তবে এ পেশায় বেশি দিন থাকেননি তিনি। এরপর শুরু করেন রিকশা চালানো। এই পেশাও ত্যাগ করেন পাঁচ বছর আগে। তারপর শুরু করেন অনলাইনে প্রতারণা, হ্যাকিং কার্যক্রম ও মাদক ব্যবসা। কিন্তু স্কুলের গণ্ডিতে পা না রাখা ৩২ বছরের এই যুবক হ্যাকিং শিখলেন কিভাবে?
ওহিদুলের এই উত্থানের গল্প ঢাকা রিপোর্টারকে বলেন তাঁরই চাচাতো ভাই সেন্টু মোল্লা। তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে ওঠাবসা করেন। ওহিদুল সম্পর্কে সেন্টুর ভাষ্য, রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ ছেড়ে রিকশা চালানোর সময় এলাকার কিছু প্রতারক হ্যাকারদের সঙ্গে সখ্য তৈরি হয় ওহিদুলের। তাদের মাধ্যমেই হ্যাকিংয়ে হাত পাকান তিনি। অল্প দিনের মধ্যেই হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ হ্যাকার। অল্প সময়ের ব্যবধানে তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে একটি হ্যাকার চক্র। সেই চক্রের সদস্যদের কাছে ‘হ্যাকিং গুরু’ হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।
হ্যাকিং জগতে পা রাখার পর থেকেই হু হু করে তাঁর সম্পদ বাড়তে শুরু করে। মোহরকয়ায় বাবার বাড়ি থাকলেও বিলমাড়িয়ায় পদ্মা নদীর ধারে পাকা বাড়িও করেছেন ওহিদুল। কয়েক বছরের ব্যবধানে বাড়ি–গাড়ির মালিক হন, গড়ে তোলেন মহিষ ও কবুতরের খামার। তাঁর খামারে লাখ টাকা দামের কবুতর ও মহিষ আছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে তৈরি করেছিলেন অবাক করা ব্যবস্থা। গ্রেপ্তার এড়াতে পুলিশের ওপর নজরদারি করার জন্য গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে নিজের বাড়ি পর্যন্ত বসিয়েছিলেন ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা। থাকতেন কবুতরের ঘরের ভেতর। সেখানে বসেই মনিটরিং করতেন সবকিছু। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি ওহিদুলের। গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, উঁচু ইটের প্রাচীরবেষ্টিত বাড়িতে ঢোকার ফটক একটাই। এ জন্য স্থানীয় লোকজন তেমন একটা যাতায়াত করেন না। তবে বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত তরুণদের যাতায়াত ছিল সেখানে। নাম প্রকাশ না করে ওহিদুলের একজন প্রতিবেশী বলেন, বাড়ির আশপাশে এত সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, কবুতরচোর ঠেকানোর জন্য ক্যামেরা লাগিয়েছেন।
হ্যাকিংয়ের পাশাপাশি করতেন মাদক ব্যবসাও। আর এ কারণেই অল্প সময়ে বিপুল অর্থের মালিক হন ওহিদুল। তিনি দামি গাড়ি নিয়ে এলাকায় চলাফেরা করতেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে লালপুরে ভাড়ায় চালিত একটি প্রাইভেট কারের চালক বলেন, ওহিদুল গাড়ি ভাড়া নিয়ে পাবনা ও রাজশাহীতে যেতেন। কখনো কখনো সারা রাত গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াতেন। দামদর করে জিনিস কিনতেন না। খাবার হোটেলের কর্মচারীদের হাজার হাজার টাকা বকশিশ দিতেন। ভাড়ার বাইরে তাঁদের ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা বকশিশ দিতেন।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন হ্যাকিং গুরু ওহিদুল
২০টি সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি হ্যাকিংয়ের জন্য ৭টি মুঠোফোনে অদলবদল করে ব্যবহার করতেন ৬৮টি সিম। ঘুমানোর জন্য কবুতরের ঘরের মধ্যে তৈরি করেছিলেন বিছানা। সেখানে ছিল সিসিটিভি মনিটর, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ নানা সুবিধা। তবু শেষরক্ষা হয়নি তাঁর। সোমবার সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ।
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ওহিদুল মোল্লা ইমো হ্যাকিং চক্রের রাজধানীখ্যাত বিলমাড়িয়া গ্রামের হ্যাকার সম্রাট। তাঁর অধীনে এলাকায় হ্যাকার চক্র গড়ে উঠেছে। সবাই তাঁকে গুরু হিসেবে মানেন। নির্বিঘ্নে হ্যাকিং কার্যক্রম চালাতে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে নানা কৌশল অবলম্বন করেন ওহিদুল মোল্লা। প্রধান সড়ক থেকে নিজ বাড়ি পর্যন্ত স্থাপন করেন অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা। যেন পুলিশ প্রধান সড়ক থেকে নামামাত্র তিনি পালাতে পারেন। তাঁর কাছে শিখে অনেকেই এই কার্যক্রমে জড়িয়েছেন।
পুলিশ জানায়, ওহিদুল প্রাচীরঘেরা পাকা বাড়ির একটি কক্ষে কয়েক শ কবুতর রাখার বাসা বানিয়েছেন। এর মধ্যে একটি খাটে তিনি ঘুমান। বাইরে থেকে দেখে কেউ বুঝতে পারবেন না, সেখানে মানুষের থাকার ব্যবস্থা আছে। আরাম–আয়েশের জন্য সেই ঘরে দামি আসবাব, সিসিটিভি মনিটর ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসিয়েছেন। এখানে বসে তিনি হ্যাকিং করে অন্যের মুঠোফোনের নিয়ন্ত্রণ নিতেন। যাতায়াতের জন্য দামি মোটরসাইকেল ব্যবহার করতেন।
ঘর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন অপারেটরের ৬৮টি সিম কার্ড। সেগুলোর নম্বর সাদা কাগজে ছক করা ছিল। কোনটা বিকাশ, কোনটা নগদ, হিসাব রাখতে সাংকেতিক চিহ্ন দেওয়া আছে। ওহিদুল ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা করতেন।
ঢাকা রিপোর্টার/দেবযানী
