Father Murdered by Daughter : নিজের জন্মদাতাকে কেন খুন করেছিলেন শিফা?
![]() |
| জান্নাতুল জাহান শিফা |
নিজের জন্মদাতাকে কেন খুন করেছিলেন শিফা?
স্টাফ রিপোর্টার: ২০২৫ সালের ৮ মে। এদিন ভোররাতে সাভার পৌরসভার মজিদপুর এলাকায় মেয়ে জান্নাতুল জাহান শিফার হাতে খুন হন আব্দুস সাত্তার (৫৬)। এই হত্যার খবর ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে নিজেই জানান শিফা। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। নথিতে উল্লেখ করা হয়, সেসময় শিফার হাতে রক্তমাখা একটি ছুরি ছিল এবং তার হাতেও রক্ত লেগে ছিলো।
এ ঘটনায় সেদিনই নিহত আব্দুস সাত্তারের প্রথম পক্ষের ছেলে হাসিবুর রহমান সাভার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এরপর শিফা পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করেন। বাবাকে তিনি একাই হত্যা করেছেন এবং এতে অন্য কেউ সহযোগিতা করেনি বলেও জানান।
বাবাকে হত্যার আগে তার খাবারে ২০টি ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলেন জান্নাতুল জাহান শিফা। এরপর বান্ধবীদের নিজের কক্ষে রেখে বাইরে থেকে দরজা আটকে বাবার কক্ষে যান তিনি। অন্ধকারে লোহার শিলপাটা দিয়ে বাবার মাথায় আঘাতের পর ছুরি দিয়ে পিঠ, ঘাড়, গলা ও পেটে আঘাত করেন। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর বাবার একটি পেনড্রাইভ খুঁজতে থাকেন তিনি। ওই পেনড্রাইভে তার কিছু ভিডিও ছিল বলে দাবি করেন শিফা।
২০২৫ সালের ৮ মে ঢাকার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফরোজা সুলতানা সুইটির আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের এ বর্ণনা দেন শিফা।
জবানবন্দিতে শিফা দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাবার কাছ থেকে যৌন নির্যাতন, মারধর, ব্ল্যাকমেইল ও হুমকির শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনা জানিয়ে সহায়তা না পাওয়ার ক্ষোভও ছিল তার। একপর্যায়ে বাবার বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিতে পরিবারের সদস্যদের চাপ ও হত্যার হুমকিতে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
যেভাবে শুরু হয় বাবা-মেয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন
শিফার জবানবন্দি অনুযায়ী, তার বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর তখন তার মা মারা যান। এরপর খালাদের কাছে বড় হন তিনি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা তার খোঁজ নেন। খালাদের পরিবারের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বাবা তাকে জোর করে নিজের কাছে নিয়ে যান। এরপর নানাবাড়ি ও খালাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুরুতে বাবার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল।
নাটোরের সিংড়ায় গ্রামের বাড়িতে দাদা, বাবা ও কাকির সঙ্গে থাকতেন শিফা। তবে এক থেকে দেড় মাস পর বাবার আচরণ পরিবর্তন হতে শুরু করে। শিফার ভাষ্য, বাবা নানান অজুহাতে তার শরীরে হাত দিতেন। প্রতিবাদ করলে আর এমন করবেন না বলে আশ্বস্ত করতেন। পরে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
‘ঘুমের ওষুধ খাইয়ে নির্যাতন’
জবানবন্দিতে শিফা দাবি করেন, ২০১৯ সালের দিকে তিনি বুঝতে পারেন, বাবা তার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করছেন না। তাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হতো। ঘুমের মধ্যে কেউ তাকে স্পর্শ করছে—এমন অনুভূতিও হতো বলে দাবি করেন তিনি। একপর্যায়ে বাবাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন শিফা। তখন বাবা তাকে একটি ভিডিও দেখান। ওই ভিডিওতে বাবাকে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে দেখেন বলেও দাবি করেন শিফা। পরে ওই ভিডিও দেখিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল ও মারধর করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।
‘পরিবারকে জানিয়েও বিশ্বাস পাইনি’
শিফার দাবি, ২০২১ সালের দিকে তার কিডনিতে সমস্যা ধরা পড়ে। একই সময়ে তাকে মাদকাসক্ত করে ফেলা হয়। বাবার আগের পক্ষের স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে বিষয়টি জানান শিফা এবং কিছু ছবি ও প্রমাণ দেন। তবে তারা তাকে বিশ্বাস না করে বাবার পক্ষ নিয়েছিলেন। ২০২৩ সালের দিকে প্রচণ্ডভাবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন শিফা। ওই সুযোগে তার বাবা নিয়মিত যৌন নির্যাতন করতেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সংস্থার সহযোগিতায় উদ্ধার
২০২৩ সালের ৪ বা ৫ নভেম্বর বাবার সঙ্গে আবারও এমন একটি ঘটনা (যৌন নির্যাতন) ঘটে শিফার। পরদিন তিনি ‘ফাউন্ডেশন ফর উইমেন পসিবিলিটিজ’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই সংস্থার মাধ্যমে রাজশাহীর একটি সংগঠনের সন্ধান পান। পরে পুলিশ তাকে বাবার বাসা থেকে উদ্ধার করে।
২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর আদালতের মাধ্যমে রাজশাহীর ওই সংস্থায় আশ্রয় নেন শিফা। তখন বাইরের কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না এবং মামলার বিষয়টি ওই সংস্থাই দেখাশোনা করত। এরপর ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর আদালত তাকে নিজ জিম্মায় ছেড়ে দেন। এরপর বাবার সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখতে চাননি শিফা। তাই ঢাকার মোহাম্মদপুরে বান্ধবী নুসরাতের বাসায় থাকতে শুরু করেন তিনি।
আবার বাবার বাসায় ফেরেন
জবানবন্দিতে শিফা বলেন, তার বাবা নুসরাতের এক বন্ধুর মাধ্যমে ঠিকানা সংগ্রহ করেন। পরে নুসরাতের ফোনে যোগাযোগ করে তাকে আরেকটি সুযোগ দিতে অনুরোধ করেন। বাবা বদলে গেছেন—এমন আশ্বাসে ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি আবার বাবার বাসায় যান শিফা। সঙ্গে ছিলেন বান্ধবী নুসরাত। সেখানে ঋতু নামে এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয় হয় তার। কিছুদিন তারা একসঙ্গে থাকেন। পরে নুসরাত চলে গেলে শিফা ও ঋতু সেখানেই ছিলেন। মার্চের শেষ দিকে শিফার বাবা পাশের একটি কক্ষে থাকতে শুরু করেন। সেসময় থেকে মাঝে মধ্যে অপরিচিত নারীদের বাসায় আসা-যাওয়া ছিল।
এরপর ঋতু তার বাবার সঙ্গে থাকতে শুরু করেন বলে দাবি করেন শিফা। ঈদের তিন দিন আগে ঋতু কাউকে কিছু না বলে চলে যান এবং পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ঋতুর বিষয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি অসুস্থ হয়ে বাড়ি চলে গেছেন বলে জানান—এমনটাই জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন শিফা। এরপর বাবা ও মেয়ে আলাদা কক্ষে থাকতে শুরু করেন।
মামলা তুলে নিতে চাপ ও হত্যার হুমকি
শিফার ভাষ্য অনুযায়ী, বাবার সঙ্গে তার প্রায়ই ঝগড়া হতো। বিশেষ করে তার করা মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। বাবার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও তাদের ছেলেরা তাকে গালিগালাজ ও হত্যার হুমকি দিতেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এর মধ্যে ৭ মে ছিল শিফার জন্মদিন। ওই দিন বাবার মোবাইলে একটি কথোপকথন শুনে ফেলেন তিনি। সেখানে তাকে ধর্ষণ ও পরে হত্যার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। এরপরই বাবাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন শিফা।
২০টি ঘুমের ওষুধ, এরপর ছুরি
শিফার জবানবন্দি অনুযায়ী, নিজের কাছে থাকা ২০টি ঘুমের ওষুধ রাতের খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেন। তখন বাসায় ইয়াসমিন, টুনটুনি ও তার বাবা আব্দুস সাত্তার ছিলেন। রাত সাড়ে ৩টার দিকে ইয়াসমিন ও টুনটুনিকে অনলাইনে দেখে রুমে আসতে বলেন শিফা। তারা প্রথমে আসতে না চাইলেও পরে তাদের নিয়ে আসেন। নিজের কক্ষে রেখে ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে দরজা বাইরে থেকে আটকে দেন তিনি। এরপর বাবার কক্ষে যান শিফা।
অন্ধকারে দরজার পাশে থাকা লোহার শিলপাটা বাবার মাথার দিকে ছুড়ে মারেন। এরপর ছুরি দিয়ে বাবার পিঠে কয়েকবার এবং ঘাড়ের পেছনে আঘাত করেন। পরে কক্ষের লাইট জ্বালিয়ে গলা ও পেটে ছুরিকাঘাত করতে থাকেন। একপর্যায়ে বাবার মৃত্যু হয়েছে বুঝতে পারেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।
পেনড্রাইভ খুঁজেও পাননি
বাবার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর শিফা তার ঘরের বিভিন্ন জিনিসের চাবি এবং একটি পেনড্রাইভ খুঁজতে থাকেন। ওই পেনড্রাইভে তার কিছু ভিডিও ছিল বলে দাবি করেন তিনি। তবে সেটি খুঁজে পাননি। পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে হত্যার খবর দেন।
মামলার বর্তমান অবস্থা
আব্দুস সাত্তার হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাভার থানার এসআই মো. ইমরান হোসেন ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর জান্নাতুল জাহান শিফাকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা শিফার বিরুদ্ধে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠন শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। ঢাকার জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ সরওয়ার আলমের আদালতে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। গত ২ আগস্ট শুনানি শেষে অভিযোগ গঠনের জন্য এ দিন ধার্য করা হয়। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. হাসান আলী বিষয়টি জানিয়েছেন।
ঢাকা রিপোর্টার/শিমুল
