তেরো টাকায় ছয় বছরের মেয়েকে বিক্রি করেন বাবা
![]() |
| তেরো টাকায় ছয় বছরের মেয়েকে বিক্রি করেন বাবা |
তেরো টাকায় ছয় বছরের মেয়েকে বিক্রি করেন বাবা
তাওহীদাহ্ রহমান নূভ: ঢাকার জাতীয় জাদুঘরের তৃতীয় তলায় ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগের একটি গ্যালারিতে কাচের বাক্সের ভেতর নীরবে পড়ে আছে বাংলার অতীতের কয়েকটি দলিল। পুরোনো মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি ও বিবর্ণ কাগজের ভিড়ে পাশাপাশি রাখা দুটি বাংলা দলিল প্রথম দেখায় খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু সেগুলোর অক্ষর পড়তে শুরু করলে প্রায় দুই শতাব্দী আগের বাংলার এক নির্মম বাস্তবতা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
একটির নাম মানুষ বিক্রির দলিল। অন্যটির আত্মবিক্রয় (নিজেকে বিক্রির) দলিল। প্রথম দলিলটির বয়স প্রায় ২১৯ বছর। ১৮০৭ সালে ময়মনসিংহ অঞ্চলের জনৈক সদারাম দাস তাঁর ছয় বছর বয়সী মেয়েকে কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতির কাছে বিক্রি করেছিলেন। বিনিময়ে তিনি পেয়েছিলেন ১৩ টাকা সিক্কা। পরের বছর, ১৮০৮ সালে একই ব্যক্তির কাছে নিজের স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ নিজেকেও বিক্রি করেছিলেন সেখ মামুদা। চারজন মানুষের বিনিময়ে তিনি পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন টাকা সিক্কা। দুটি দলিলের ক্রেতা একই মানুষ। কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি। ধারনা করা হয়—এই কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি সেসময় ময়মনসিংহের কোনো একটি এলাকার জমিদার গোত্রের কেউ ছিলেন। যার ছিলো অসংখ্য দাস-দাসী।
দুটি দলিলের সামনে দাঁড়ালে সবচেয়ে স্বাভাবিক যে প্রশ্নটি মনে আসে, তা হলো—একজন বাবা কীভাবে নিজের ছয় বছরের সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হলেন? একজন মানুষ কেন স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নিজেকেও অন্যের হাতে তুলে দিলেন?
দলিলের অক্ষর সেই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর দেয় না। কিন্তু ইতিহাসের অন্যান্য দলিল, গবেষণা ও তৎকালীন বাংলার সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে এই ঘটনাগুলোকে পাশাপাশি রাখলে একটি কঠিন সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় এই বাংলায় এমন মানুষও ছিলেন, যাঁদের কাছে স্বাধীনতার চেয়ে এক মুঠো খাবার ছিল জরুরি। ক্ষুধা, ঋণ, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও অনিশ্চিত জীবনের চাপে কেউ কেউ নিজের শরীর, শ্রম এমনকি সন্তানদের ভবিষ্যৎ পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
এই দুটি দলিল তাই কেবল পুরোনো কাগজ নয়। এগুলো মানুষের অসহায়ত্বের দলিল। এগুলো বাংলার দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রামের দলিল। একই সঙ্গে এগুলো বাংলায় স্থানীয় মানুষের দাসত্বে পতিত হওয়ার ইতিহাসেরও বিরল সাক্ষ্য।
তেরো টাকা সিক্কা একটি শিশুর মূল্য
১৮০৭ সাল। ময়মনসিংহ পরগনার হাসানপুর চাকলার বাসিন্দা জনৈক সদারাম দাস তাঁর ছয় বছর বয়সী মেয়েকে কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি নামের এক জমিদার গোত্রীয় লোকের কাছে বিক্রি করে দেন। যার বিনিময়ে পান মাত্র ১৩ টাকা সিক্কা। আজকের চোখে এই ঘটনা কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে দলিলের ভাষা পড়লে। সেখানে শুধু শিশুটিকে বিক্রির কথা বলা হয়নি; তার ওপর ক্রেতার অধিকার এবং সেই অধিকার পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত করার কথাও রয়েছে। কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতি, তাঁর ছেলে এবং তাঁদের বংশধররা মেয়েটির ওপর অধিকার ভোগ করবেন, এমনকি তার ভবিষ্যৎ সন্তানরাও সেই অধিকারের আওতায় থাকবে। অর্থাৎ এটি শুধু একটি শিশুকে বিক্রির দলিল ছিল না। একটি মানুষের জীবন, শ্রম ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও মালিকানার মধ্যে নিয়ে আসার দলিলও ছিল।
দুঃখজনকভাবে দলিলটির একটি অংশ সময়ের ক্ষয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে মেয়েটির নাম জানা যায়নি। জানা যায়নি, বিক্রির পর তার জীবন কোথায় গিয়ে থেমেছিল, কিংবা তার পরিণতি কী হয়েছিল। ইতিহাসের এই জায়গাতেই কখনো কখনো একটি দলিল সবচেয়ে বেশি নীরব হয়ে যায়। কাগজে লেখা থাকে একটি মানুষের বিক্রির মূল্য, কিন্তু সেই মানুষের কান্না, ভয়, ক্ষুধা কিংবা পরবর্তী জীবনের কোনো বিবরণ থাকে না।
সাড়ে তিন টাকায় নিজেকেসহ পরিবার বিক্রি
১৮০৮ সাল। আগের ঘটনার এক বছর পরের আরেকটি দলিল। ময়মনসিংহের গৌরীপুর এলাকার মরিচালি গ্রামের জনৈক সেখ মামুদা নিজের স্ত্রী এবং দুই সন্তান সেখ দুতিয়া ও সেখ কাঙ্গালিয়াকে নিয়ে নিজেকেও বিক্রি করে দেন সেই একই ব্যক্তি, কৃষ্ণকিঙ্কর বাচস্পতির কাছে। চারজন মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল সাড়ে তিন টাকা সিক্কা।
এই দলিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিক্রির কারণ সম্পর্কে এখানে তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। খাবার ও কাপড়ের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ ঘটনাটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত চুক্তি ছিল না; অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে একটি পরিবার নিজেদের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়েছিল। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এই বিক্রির পরিধি কেবল ওই চারজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সেই চুক্তির আওতায় পড়েছিল। ক্রেতার অধিকার পরবর্তী সন্তানদের ওপরও বিস্তৃত করার কথা দলিলে উল্লেখ ছিল।
একটি পরিবারের ক্ষুধা তাই শুধু তাদের বর্তমান জীবনকে নয়, অনাগত প্রজন্মকেও বন্দিত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারত।
মানুষ যখন নিজের স্বাধীনতার মূল্য দিতে বাধ্য হয়
এই দুটি দলিলকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো শুধু দুজন মানুষের দুর্ভাগ্যের গল্প মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলার ইতিহাসের বৃহত্তর পরিসরে এগুলোকে রাখলে বোঝা যায়, মানুষ বিক্রি ও আত্মবিক্রয়ের ঘটনা একেবারে বিরল ছিল না।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত এই দুটি দলিল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটির বিষয় ছিল উনিশ শতকের বাংলায় দাসত্বের চর্চা এবং জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত দুটি অপ্রকাশিত মানুষ বিক্রির দলিল।
গবেষণায় দেখা যায়, সেখ মামুদার দলিলে খাদ্য ও বস্ত্রের প্রয়োজনকে বিক্রির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। অর্থাৎ জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারার পরিস্থিতি একজন মানুষকে নিজের স্বাধীনতা এবং পরিবারের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বাংলার সামাজিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও এখান থেকে সামনে আসে। দাসত্ব সবসময় কেবল যুদ্ধবন্দী বা দূরদেশ থেকে ধরে আনা মানুষের ভাগ্য ছিল না। স্থানীয় দরিদ্র মানুষও কখনো কখনো অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে এই ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়ত।
বাংলায় দাসপ্রথার দীর্ঘ ছায়া
দাসপ্রথার কথা উঠলে বিশ্ব ইতিহাসে প্রথমেই হয়তো আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার কথা মনে পড়ে। ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোতে লাখ লাখ আফ্রিকান মানুষকে জোর করে নিয়ে গিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষ কেনাবেচার ইতিহাস শুধু আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারের ইতিহাস নয়। বাংলার মাটিতেও এর বহু পুরোনো চিহ্ন রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ আকবর আলি খান তাঁর দারিদ্র্যের ইতিহাস ও অর্থনীতি নিয়ে লেখা গ্রন্থে বাংলার দাসপ্রথা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর গবেষণায় প্রাচীন আইন, পর্যটকদের বিবরণ, বিদেশি ব্যবসায়ীদের লেখা এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথির ভিত্তিতে বাংলায় স্থানীয় মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি এমন ধারণার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন যে বাংলায় কেবল বিদেশ থেকে আসা দাসদেরই কেনাবেচা করা হতো। বরং তাঁর বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলার স্থানীয় মানুষও দাসত্বের বাজারের অংশ হয়ে উঠেছিল।
চতুর্দশ শতকে বাংলায় আসা মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার বিবরণেও এমন মানুষের কেনাবেচার উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে জানা যায়, তিনি বাংলায় দাসী কিনেছিলেন। তাঁর এক সঙ্গীও অল্পবয়সী এক দাস কিনেছিলেন।
পর্তুগিজ ব্যবসায়ী দুয়ার্তে বারবোসার বিবরণেও বাংলায় স্থানীয় মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রির কথা পাওয়া যায়। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, কিছু ব্যবসায়ী বাংলার হিন্দু পরিবার থেকে শিশু কিনে পরে তাদের দাস হিসেবে বিক্রি করত।
মোগল আমলের নথিতেও দাস কেনাবেচার উল্লেখ রয়েছে। আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরীতে ঘোড়াঘাট ও সিলেট অঞ্চলে খোজা দাসের বেচাকেনার তথ্য পাওয়া যায়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্মৃতিকথাতেও সিলেটের কিছু পরিবারের সন্তানদের খোজা করে শাসকদের দেওয়ার প্রথার উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীর এই প্রথা বন্ধের নির্দেশ দেন এবং খোজা কেনাবেচার জন্য শাস্তির বিধান করেন।
অর্থাৎ বাংলায় দাসত্বের ইতিহাস কোনো একক সময় বা একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এর রূপ বদলেছে।
কারা বিক্রি হতো?
আকবর আলি খান ১২টি মানুষ বিক্রির দলিল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, বিক্রি হওয়া ব্যক্তিদের সবাই বাংলার স্থানীয় বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর বিশ্লেষণে চার ধরনের মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়। একদিকে ছিলেন নিঃস্ব স্বাধীন মানুষ। অন্যদিকে স্বাধীন মানুষের ওপর নির্ভরশীল শিশু। এর পাশাপাশি আগে থেকেই দাসত্বে থাকা মানুষ এবং দাসদের সন্তানরাও এই ব্যবস্থার মধ্যে ছিল।
এই তথ্যটি বাংলার দাসপ্রথার ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, দাসত্ব সবসময় জোর করে কাউকে দূরদেশ থেকে ধরে আনার ফল ছিল না। কখনো অর্থনৈতিক বিপর্যয়, কখনো নির্ভরশীলতা, কখনো পারিবারিক দুরবস্থা এবং কখনো জন্মসূত্রেও মানুষ এই অবস্থায় আটকে যেত।
ইতিহাসবিদ ইন্দ্রাণী চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণাতেও আঠারো ও উনিশ শতকের বাংলায় শিশুদের দাসত্বে নিয়ে যাওয়ার নানা তথ্য পাওয়া যায়। ময়মনসিংহ, ঢাকা ও সিলেট থেকে ছেলে-মেয়েদের কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার নজির ছিল। ইউরোপীয়দের কেউ কেউ অল্প দামে এসব শিশু কিনে গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত করতেন।
একটি শিশুর কাছে তখন পৃথিবী হয়তো ছিল ঘর, মা-বাবা, ভাইবোন আর পরিচিত উঠান। কিন্তু দারিদ্র্যের কাছে সেই পৃথিবীও কখনো কখনো বিক্রি হয়ে যেত।
দলিলগুলো কোথা থেকে এলো?
জাতীয় জাদুঘরের এই দুটি দলিল সবসময় এতটা দৃশ্যমান ছিল না। ১৯৮০ সালে ময়মনসিংহের গৌরীপুরের দৌহাখোলা গ্রামের সুরেন্দ্র চন্দ্র লস্করের কাছ থেকে দলিল দুটি সংগ্রহ করা হয়। এরপর এগুলো জাতীয় জাদুঘরের ইতিহাস ও ধ্রুপদি শিল্পকলা বিভাগে সংরক্ষিত হয়ে আসছে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি শাখায় বসে দলিল দুটি পাঠোদ্ধারের কাজ করেন বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও পুরোনো বাংলা দলিলপত্রের গবেষক নাজমুল হোসেন। তাঁর পাঠোদ্ধার অনুযায়ী, দলিল দুটি তুঁতের কাগজে বাংলা ভাষায় লেখা। প্রথম দলিলটি ১২১৪ বঙ্গাব্দের ৩ শ্রাবণ, অর্থাৎ ১৮০৭ সালের। সময়ের ক্ষয়ে দলিলটির কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শিশুটির নাম উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
দ্বিতীয় দলিলটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। সেখানে সেখ মামুদা, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানের বিক্রির কারণ সম্পর্কে খাদ্য ও বস্ত্রের প্রয়োজনের কথা জানা যায়।
একটি পুরোনো কাগজ কখনো কখনো কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। তার কালি বিবর্ণ হয়, কাগজ ক্ষয়ে যায়, কিছু শব্দ হারিয়ে যায়। কিন্তু মানুষের অসহায়তার ইতিহাস মুছে যায় না।
আরও অনেক মানুষের বিক্রির দলিল
জাতীয় জাদুঘরের এই দুটি দলিল বাংলায় মানুষ বিক্রির একমাত্র প্রমাণ নয়। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সিলেট সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিসের মহাফেজখানা থেকে পাওয়া ১৮০৬ ও ১৮০৭ সালের কয়েকটি দলিলের কথা সামনে আসে। সেখানে শেখ বিআনিয়া ১০ টাকায় নিজেকে বিক্রি করেছিলেন। ১৭ বছর বয়সী গনাই ভান্ডারির মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল ২৫ টাকা। ভূবিদাসী ও তাঁর ছেলে সনাইকে বিক্রি করা হয়েছিল ২৮ টাকায়।
কোনো কোনো দলিলে ঋণ পরিশোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। আবার কোথাও উল্লেখ রয়েছে, বিক্রি হওয়া ব্যক্তির পরবর্তী প্রজন্মও একই মালিকের অধীনে থাকবে।
১৭৯০ সালের আরেকটি নথিতে চার বছর বয়সী জমিয়তকে পাঁচ কাহন কড়িতে বিক্রির কথা পাওয়া যায়। সেখানেও দারিদ্র্য ছিল এই ভয়াবহ সিদ্ধান্তের পেছনে। সিলেটের ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দিন আহমদ জাদুঘরেও রয়েছে ১৮৩৬ সালের একটি মানুষ বিক্রির দলিল। সেখানে জকিগঞ্জের ১২ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুকে ১১ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাফেজখানায় সংরক্ষিত ১৬৪৯ থেকে ১৭৫৪ সালের মধ্যে বিক্রি হওয়া ১৯ জন মানুষের একটি তালিকায় অন্তত ১২ জনের ক্ষেত্রে অনাহারকে বিক্রির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও সংরক্ষিত আছে মানুষ বিক্রির একটি প্রাচীন দলিল। গাছের বাকলে লেখা সেই নথিটির বয়স প্রায় ৩৮৮ বছর। এর পাঠোদ্ধার করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহজাহান মিয়া।
ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী শব্দটি হয়তো ‘অভাব’
মানুষ বিক্রির এই দলিলগুলো পড়লে ইতিহাসকে কেবল রাজা-বাদশাহ, যুদ্ধ, সাম্রাজ্য কিংবা রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্প বলে মনে হয় না। ইতিহাসের আরেকটি মুখ তখন সামনে আসে, যেখানে কোনো রাজপ্রাসাদ নেই, কোনো বিজয়ীর নাম নেই, নেই যুদ্ধের গৌরব। আছে ক্ষুধার্ত মানুষ। আছে ঋণে ডুবে যাওয়া পরিবার। আছে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সন্তানকেই অন্যের হাতে তুলে দেওয়া বাবা। আছে এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে নিজের স্বাধীনতার দাম নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছেন।
১৮০৭ সালের সেই ছয় বছরের মেয়েটির নাম আমরা জানি না। জানি না, ১৩ টাকা সিক্কায় বিক্রি হওয়ার পর তার জীবনে কী ঘটেছিল। জানি না, সে কখনো নিজের পুরোনো বাড়িতে ফিরে যেতে পেরেছিল কি না। জানি না, তার মা তাকে শেষবার কী বলেছিলেন কিংবা তার বাবা কীভাবে সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ইতিহাস কখনো কখনো মানুষের নাম সংরক্ষণ করতে পারে না। সংরক্ষণ করে শুধু একটি সংখ্যা, একটি তারিখ, একটি মূল্য। তেরো টাকা। সাড়ে তিন টাকা। কিন্তু সেই সংখ্যাগুলোর আড়ালে যে জীবনগুলো ছিল, তাদের মূল্য কোনো মুদ্রায় মাপা সম্ভব নয়।
জাতীয় জাদুঘরের কাচের বাক্সে তাই পড়ে থাকা এই দলিল দুটি নিছক পুরোনো কাগজ নয়। এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি সমাজের ইতিহাস শুধু তার সমৃদ্ধির ইতিহাস নয়; তার সবচেয়ে অসহায় মানুষের ইতিহাসও তারই অংশ।
কখনো কখনো একটি পুরোনো দলিল রাজাদের চেয়ে বেশি সত্য কথা বলে। কারণ সেখানে ক্ষমতাবানের জয়গাথা নয়, লেখা থাকে বেঁচে থাকার জন্য একজন মানুষের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দেওয়ার ইতিহাস।
সেসময় দাস-দাসীদের কিনে নিয়ে কি করা হতো?
উনিশ শতক এবং তার আগের সময়টায় তৎকালীন বাংলায় কিনে নেওয়া দাস-দাসীদের মূলত গৃহস্থালির কাজ, কৃষিকাজ ও যৌন দাসী হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। তৎকালীন বাংলার সমাজব্যবস্থায় দাসপ্রথা রোমান বা আমেরিকান দাসপ্রথার মতো পুরোপুরি অমানবিক বা বন্দিশিবির-সদৃশ না হলেও, তাদের জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং তারা মালিকের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন থাকতেন।
সাধারণত কিনে নেওয়া অধিকাংশ দাস-দাসী, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের গৃহস্থালির কাজের জন্য কেনা হতো। তাদেরকে দিয়ে দৈনন্দিন কাজ (ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, পানি টেনে আনা, রান্নার কাজে সাহায্য করা এবং কাপড় ধোয়া), সেবাযত্ন (জমিদার বা বিত্তশালী মালিকের পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত সেবা ও গা-হাত-পা টিপে দেওয়া), সন্তান লালন-পালন (দাসীদের অনেক সময় মালিকের বাড়ির ছোট বাচ্চাদের দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হতো) করানো হতো।
পুরুষ দাসদের এবং শক্তসমর্থ কিশোরদের মূলত মাঠে খাটানো হতো। তাদের দিয়ে জমি চাষ করা, ফসল বোনা, ধান কাটার মতো কঠোর পরিশ্রমের কাজ, মালিকের গরু, ছাগল ও অন্যান্য গবাদি পশুর যত্ন নেওয়া এবং গোয়ালঘর পরিষ্কার করার মতো কৃষিকাজ ও পশু পালনের কাজ করানো হত।
দাস-দাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হতো মালিকের যৌনাচারে। তৎকালীন বাংলায় গৃহস্থালি ও কৃষিকাজের সমান্তরালে ক্রীতদাসীদের যৌন দাসী বা উপপত্নী হিসেবেও ব্যবহার করার একটি অন্ধকার ও নির্মম বাস্তব সত্য ছিল। এক্ষেত্রে শিশু-কিশোর বয়সী দাসেরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলো।
মুসলিম বিত্তশালী ও অভিজাত জমিদারদের পরিবারে নারী দাসীদের অনেক সময় ‘লণ্ডা’ বা উপপত্নী হিসেবে রাখা হতো। তাঁদের প্রধান কাজই ছিল মালিকের যৌন ইচ্ছা পূরণ করা। একইভাবে হিন্দু উচ্চবর্ণের ধনী পরিবারেও দাসীদের এমন শোষণের শিকার হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
তৎকালীন সমাজব্যবস্থা এবং আইনে যেহেতু ক্রীতদাসীরা আইনিভাবে কোনো স্বাধীন সত্তা ছিলেন না, বরং মালিকের ‘সম্পত্তি’ হিসেবে গণ্য হতেন, তাই মালিকের যেকোনো ধরনের শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিরোধ করার বা আইনি প্রতিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এমনকি দাস-দাসীরা মালিকের অনুমতি ছাড়া বিয়েও করতে পারতেন না।
কোনো দাসীর গর্ভে যদি মালিকের সন্তান জন্ম নিত, তবে সেই সন্তানকে সমাজে হেয় চোখে দেখা হতো এবং দাসীকে অনেক সময় ‘গর্ভদাসী’ বা ‘খাদেমাদার’ হিসেবেই জীবন পার করতে হতো। যদিও ধর্মীয় বা সামাজিক কিছু ভেদাভেদের কারণে সন্তানকে কোথাও কোথাও আংশিক স্বীকৃতি দেওয়া হতো, কিন্তু নারীর জীবনের অবমাননা কমত না।
ঢাকা রিপোর্টার/দেবযানী
