নতুন জঙ্গি সংগঠনের আতঙ্কে বাংলাদেশ
![]() |
| নতুন জঙ্গি সংগঠনের আতঙ্কে বাংলাদেশ |
নতুন জঙ্গি সংগঠনের আতঙ্কে বাংলাদেশ
স্টাফ রিপোর্টার: অনেকদিন ধরেই জঙ্গি হামলার ভয়ে আছে বাংলাদেশের প্রগতিশীল সচেতন সমাজ। এতোদিন দেশের ভেতরের জঙ্গি তৎপরতার কথা সরকার সামনে না আনলেও এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে নতুন জঙ্গিবাদী সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। দলটির নাম ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’।
কিভাবে সন্ধান মিললো নতুন জঙ্গি সংগঠনের?
গত ১৮ সেপ্টেম্বর দিনটি ছিলো শুক্রবার। সেদিন জুমার নামাজের পর রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের মসজিদে গোপন বৈঠকে বসে কিছু যুবক। সেটি ছিলো মূলত একটি জঙ্গি সংগঠনের সাংগঠনিক বৈঠক। এই গোপন বৈঠকের কথা আগে জেনে গিয়েছিলো ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সেদিন পুলিশের কাছে তথ্য এসেছিল যে, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা রাজধানীর একাধিক এলাকা থেকে এসে এই মসজিদেই একত্র হবেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগ অভিযান চালিয়ে বৈঠক থেকে ২৩ জনকে আটক করে।
আটক করার পর তাদেরকে হস্তান্তর করা হয় অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)র হাতে। এটিইউ ও সিটিটিসি’র কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই ও জেরা করে আটককৃতদের কাছ থেকে জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের বিভিন্ন তথ্য পেয়েছে। শুরুতে তারা নতুন জঙ্গি সংগঠনের নাম না জানালেও তাদের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও পরবর্তি জিজ্ঞাসাবাদে ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ নামের সংগঠনের কথা স্বীকার করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামের এই সংগঠনকে বড় জঙ্গিদলে রুপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তারা খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উগ্রবাদী তৎপরতায় সংগঠিত হচ্ছিল। এই সংগঠনের সঙ্গে বিদেশি জঙ্গিদলের যোগাযোগ রয়েছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। এ ধরনের উগ্রবাদী তৎপরতার বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স রয়েছে। বাংলাদেশে সবধরনের জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ কঠোর হাতে বন্ধ করা হবে।’
তেজগাঁওয়ের এই জঙ্গিবাদীদের গ্রেপ্তারের ঘটনার পর ফের সামনে এলো বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ। জাতিসংঘের তরফে অবশ্য আগেই আল-কায়দা সহ বিভিন্ন জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্কের বিষয়ে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোকে সতর্ক করা হয়েছিল।
২৩ জঙ্গি গ্রেপ্তারের পর কি হয়েছিল দেশে?
মৌলবাদীদের ছত্রছায়ায় বাংলাদেশে বাড়ছে জঙ্গিবাদীদের তৎপরতা। সেই সঙ্গে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে উত্থাত করে দেশকে অস্থির করে তোলার। পর্দার আড়াল থেকে বিদেশি শক্তি ও ধর্মীয় ভাবাবেগকে কাজে লাগানো হচ্ছে। তেজগাঁওয়ের মসজিদ থেকে যেদিন এই ২৩ জঙ্গি গ্রেপ্তার হলো, তার পরদিন (১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) মিরপুর ও মধ্য বাড্ডায় তিনটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি পিকআপেও অগ্নি সংযোগ করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তার পরের দিন (২০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরির চেষ্টাই চালানো হয়েছিলো। নির্বাচনে পরাজিত শক্তিই বাংলাদেশকে অস্থির করে তুলতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে মদদ দিচ্ছে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা। তবে পুলিশের কড় নজরদারির কারণে পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ বেড়ে গিয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান অবশ্য একবার বলেছিলেন, ‘দেশে জঙ্গি রয়েছে এবং জঙ্গি তৎপরতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিষয়ে সরকার কাজ করবে’।
জেল পলাতক জঙ্গিরা কোথায়?
চব্বিশের জুলাই মাসে যখন দেশ অশান্ত হয়ে উঠিছিলো, তখন বহু জঙ্গিকেই খোলা রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। সে বছর ৫ আগস্টের পর জেল থেকে ‘পালিয়ে যাওয়া’ জঙ্গিদের সবাইকে আর গ্রেপ্তার করা হয়নি। তাদের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক তালিকাভুক্ত তিনজন কট্টর জঙ্গি নেতা। তাছাড়া পলাতক বন্দিদের মধ্যে ৯ জনের বিরুদ্ধে ছিল একাধিক জঙ্গিবাদের মামলা। অনেকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকারও অভিযোগ ছিল। ইতোমধ্যে তাদের ৬ জনকে ফের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি তিন জনের কোনো খোঁজ নেই বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজিপ্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোতাহের হোসেন।
তিনি জানান, কারা কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও অন্তত ২৭ জন জঙ্গি শুধু মাত্র নরসিংদী কারাগার থেকে ‘পালিয়েছিল’। চব্বিশের ৫ আগস্টের পরপরই দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়েছে কম করে ৬৯০ জন বন্দি। তাদের অনেকেরই এখনও খোঁজ মেলেনি। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী জেল-ছুট জঙ্গিরা মৌলবাদীদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশে নতুন নতুন জঙ্গি সংগঠন গড়ে তুলছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরিই তাদের লক্ষ্য।
গোয়েন্দারা তেজগাঁও থেকে ধৃতদের জেরা করে জানতে পেরেছেন, ‘ইতেহাদুলউম্মাহ’ নামে নতুন সংগঠন গড়ে খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে জঙ্গিরা। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সামনে আসার পর আবারও উগ্রবাদ নিয়ে তাই উদ্বেগ আরও বাড়ছে। তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এখনই পরিস্থিতিকে উগ্রবাদের উত্থান হিসেবে দেখার মতো তথ্য নেই। সম্ভাব্য তৎপরতার ওপর নজরদারি চলছে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণ মানুষ অবশ্য এখনই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষপাতী। তাদের মতে, দেশকে উগ্রবাদ মুক্ত করতে হলে অঙ্কুরেই শেষ করতে হবে জঙ্গিবাদকে।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে কারা? পাকিস্তান না তো?
বাংলাদেশে বহুদিন ধরেই চলছে জঙ্গিবাদীদের রমরমা। বিদেশের অর্থ ও সহায়তায় ধর্মের নামে তারা বিস্তার করে চলেছে নিজেদের সংগঠন। মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটনের মতে, বাংলাদেশে উগ্রবাদ নতুন কোনও বিষয় নয়; দীর্ঘ দিন ধরেই এর উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘গত প্রায় দুই বছরে এ ধরনের গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড কতটা কার্যকরভাবে নজরদারিতে ছিল, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখন তারা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে, এমন কিছু আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি’।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর ভিতরেও জঙ্গিবাদীদের জাল বিস্তৃত। চলতি বছরেই চট্টগ্রামের একটি ঘাঁটি থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক ওয়ারেন্ট অফিসারের সন্ধান মিলেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) এক ডেরায়। এ ঘটনার পরই বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে উগ্রপন্থি নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়। পাকিস্তান সরকার সম্প্রতি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে, তাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত টিটিপির পক্ষে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সদস্যও কাজ করছিলেন।
প্রতিরক্ষা বাহিনীতে জঙ্গি অনুপ্রবেশ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য খুবই বিপজ্জনক। তেমনই বিপজ্জনক ছোট ছোট শিশুদের মনে মাদ্রাসার মাধ্যমে জঙ্গিবাদের বীজবপনও। এটা প্রতিহত করতেই হবে। এর জন্য চাই আরও কঠোর নজরদারি।
উল্লেখ্য, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশকে সামরিক প্রশিক্ষণ সহায়তা দেবে’- এমন তথ্য বেশ কয়েকবার সামনে এলেও বাংলাদেশ আইএসপিআর এটিকে নিছক গুজব বলেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের আইএসপিআরের বিবৃতিতে বাংলাদেশকে সামরিক প্রশিক্ষণ সহায়তার তথা জানানো হয়।
পাকিস্তানের আইএসপিআরের অই বিবৃতিতে বলা হয়, দেশটির বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধু এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খাঁন চীনের সঙ্গে যৌথভাবে উন্নয়ন করা বহুমুখী যুদ্ধবিমান জেএফ-১৭ থান্ডার ক্রয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন ইসলামাবাদে। পাকিস্তান বাংলাদেশকে 'সুপার মুশশাক' প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছে। একইসঙ্গে পাইলট প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি কারিগরি সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
এরপর থেকেই প্রশ্ন ওঠে, জঙ্গিবাদী হিসেবে পরিচিত পাকিস্তান কি তবে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে উগ্রপন্থী জঙ্গি করে তুলবে নাতো?
ঢাকা রিপোর্টার/দেবযানী
