শখ থেকে স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান: তানভীর ইসলামের আট বছরের সৃজনশীল যাত্রা

শখ থেকে স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান: তানভীর ইসলামের আট বছরের সৃজনশীল যাত্রা
শখ থেকে স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান: তানভীর ইসলামের আট বছরের সৃজনশীল যাত্রা


শখ থেকে স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান: তানভীর ইসলামের আট বছরের সৃজনশীল যাত্রা


মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী: ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন তানভীর ইসলাম। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে নিজের ভাবনা ও দক্ষতা দিয়ে আলাদা একটি পরিচয় তৈরি করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। সেই ইচ্ছা থেকেই শুরু গ্রাফিক্স ডিজাইনের চর্চা, এরপর ট্যাটু আর্টের প্রতি ভালোবাসা। একসময় নিজের হাতে কলম দিয়ে ট্যাটু আঁকার শখ থেকেই রাজশাহীতে গড়ে তোলেন একটি স্টুডিও। ২০১৮ সালে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ আজ ‘Twentythree Tattoo and Design Studio’। আট বছরের এই পথচলায় রয়েছে সৃজনশীলতার প্রতি ভালোবাসা, নতুন কিছু করার সাহস, পারিবারিক সমর্থন অর্জন এবং নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প।

শৈশবের আগ্রহ থেকে সৃজনশীলতার পথে

মানুষের জীবনে কিছু স্বপ্নের শুরু হয় খুব সাধারণ কোনো ভালো লাগা থেকে। সময়ের সঙ্গে সেই ভালো লাগাই কখনো হয়ে ওঠে জীবনের লক্ষ্য, তৈরি করে নিজের পরিচয় গড়ার পথ। তানভীর ইসলামের গল্পটিও তেমন। ছোটবেলা থেকেই ইউনিক ও সৃজনশীল জিনিসের প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল। নিজের মতো করে কিছু তৈরি করা কিংবা পরিচিত কোনো ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পেতেন তিনি। মনের ভেতর ইচ্ছা ছিল, নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে এমন কিছু করবেন, যার মাধ্যমে মানুষের কাছে আলাদা পরিচিতি তৈরি হবে।

তানভীরের সৃজনশীল যাত্রায় প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় নবম শ্রেণির শেষ দিকে। তখন থেকেই গ্রাফিক্স ডিজাইন শেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। নিজে নিজে শেখার চেষ্টা করেন, টুকটাক কাজ করতে শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে ডিজাইনের জগতে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। মজার বিষয় হলো, ছোটবেলায় তিনি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ছবি আঁকা শেখেননি। বরং একসময় আর্টের বিষয়টি তাঁর কাছে কিছুটা ভীতিকর মনে হতো। অথচ সময়ের সঙ্গে সেই অপরিচিত জগতের প্রতিই তৈরি হয় গভীর ভালোবাসা। ডিজাইনের মাধ্যমে নিজের ভাবনাকে দৃশ্যমান রূপ দেওয়ার সুযোগ তাঁকে আকৃষ্ট করে। এই আগ্রহই পরবর্তী সময়ে তাঁকে ট্যাটু ডিজাইনের জগতে নিয়ে আসে।

নিজের হাতে আঁকা ট্যাটু থেকে নতুন সম্ভাবনা

দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই ট্যাটু ডিজাইনের প্রতি বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয় তানভীরের। নিজের হাতে কলম দিয়ে বিভিন্ন নকশা আঁকতেন তিনি। কিন্তু কলমের আঁকা নকশা বেশিদিন স্থায়ী হতো না। তাই এমন উপায় খুঁজতে শুরু করেন, যার মাধ্যমে পছন্দের নকশা তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সম্ভব। বিভিন্ন বিকল্প সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার পর প্রথমে মেহেদি দিয়ে নিজের হাতে ট্যাটু ডিজাইন করতে শুরু করেন। পরে অস্থায়ী ট্যাটুর জন্য ব্যবহৃত বিশেষ কালি সংগ্রহ করে নিজের হাতে নকশা তৈরি করার চর্চা চালিয়ে যান।

এই শখই একসময় অন্যদের আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তানভীরের হাতে ট্যাটু দেখে বন্ধু, ভাই ও পরিচিতজনেরা জানতে চাইতেন, কোথা থেকে তিনি ট্যাটু করিয়েছেন। নিজের হাতে নকশাগুলো তৈরি করার কথা জানার পর তাঁরাও একই ধরনের ট্যাটু করানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁদের অনুরোধে তানভীর অন্যদের হাতে ট্যাটু ডিজাইন করে দিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। পরিচিতজনদের গণ্ডি ছাড়িয়ে নতুন মানুষের কাছেও তাঁর কাজ পৌঁছাতে শুরু করে।

একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারেন, নিজের ভালো লাগার এই কাজটিকে আরও গোছানোভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। শখের কাজকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয় দেওয়ার চিন্তা থেকেই স্টুডিও প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

২০১৮ সালে যাত্রা শুরু

২০১৮ সালে কলেজের প্রথম বর্ষে পড়ার সময় রাজশাহীতে ছোট পরিসরে একটি ট্যাটু স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেন তানভীর। নাম দেন ‘Tattoo Studio Rajshahi’। শুরুটা ছিল সীমিত পরিসরে। বড় কোনো আয়োজন কিংবা সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নয়, বরং নিজের আগ্রহ ও মানুষের চাহিদাকে কেন্দ্র করেই যাত্রা শুরু হয়েছিল।

তবে এই উদ্যোগের কথা প্রথম দিকে পরিবারকে জানাননি তিনি। ট্যাটু নিয়ে সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিবারের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে সংশয় ছিল তাঁর। ফলে স্টুডিও প্রতিষ্ঠার পর প্রায় এক বছর নিজের উদ্যোগের কথা গোপন রেখেই কাজ চালিয়ে যান। এদিকে ট্যাটুর নকশা ও কাজের মানের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ায় মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। তানভীরের কাছে এটি ছিল নিজের দক্ষতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরির সুযোগ।

একটি ছোট উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখা এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে নেওয়া সহজ নয়। প্রয়োজন হয় ধৈর্য, নিয়মিত কাজ এবং মানুষের আস্থা অর্জনের। তানভীরের ক্ষেত্রেও মানুষের আগ্রহ তাঁকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ জুগিয়েছে। পরিচিতদের জন্য ট্যাটু ডিজাইন করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ক্রমে একটি প্রতিষ্ঠানের রূপ নিতে থাকে।

ট্যাটু থেকে লেজার ট্রিটমেন্ট ও ডিজাইনের বিস্তার

তানভীরের উদ্যোগে নতুন মাত্রা যোগ হয় ২০১৯ সালে। তিনি লক্ষ করেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে স্থায়ী ট্যাটু করানো অনেক মানুষ পরে সেগুলো অপসারণ করতে চাইছেন। এ জন্য তাঁদের অনেককে ঢাকায় যেতে হতো। কেউ কেউ রাজশাহীতে ট্যাটু অপসারণের ব্যবস্থা করার অনুরোধও জানান। তাঁদের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে তানভীর লেজার মেশিন সংগ্রহ করেন এবং স্থায়ী ট্যাটু অপসারণের সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেন।

পরবর্তী সময়ে তিল, আঁচিল, মেছতা ও হাতের কাটা দাগের মতো বিভিন্ন সমস্যায় লেজারভিত্তিক সেবার কাজও শুরু করেন বলে জানান তিনি। পাশাপাশি অল্প পরিসরে শুরু করেন ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজ। গ্রাফিক্স ডিজাইনের প্রতি আগে থেকেই আগ্রহ থাকায় ডিজাইনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়। এভাবে ট্যাটু আর্টের পাশাপাশি তাঁর উদ্যোগের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে।

সময়ের সঙ্গে স্টুডিওতে বিদেশি গ্রাহকদের আগমনও বাড়ে বলে জানান তানভীর। নিজের কাজের প্রতি যত্ন এবং নকশার মান বজায় রাখার চেষ্টাকে তিনি এই অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেন। ছোট পরিসরে শুরু করা উদ্যোগটি ধীরে ধীরে তাঁর সৃজনশীল কাজের একটি বিস্তৃত পরিসরে পরিণত হয়।

‘Twentythree’ নামের পেছনের গল্প

২০২৩ সাল তানভীরের জীবনে একই সঙ্গে অর্জন ও হারানোর স্মৃতি নিয়ে এসেছে। ওই বছর তিনি ‘Studio Artist Award’ অর্জন করেন। নিজের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এই অর্জন তাঁর যাত্রায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি জীবনের অনেক কিছু হারিয়েছেন বলেও জানান তিনি। ফলে ২৩ সংখ্যাটি তাঁর কাছে হয়ে ওঠে এক বিশেষ স্মৃতির প্রতীক, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাফল্য ও ব্যক্তিগত বেদনা।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই নিজের স্টুডিওর নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘Twentythree Tattoo and Design Studio’। নামটি তাঁর কাছে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় নয়; বরং জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের স্মারক। এর মধ্য দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন তিনি।

পরিবারের সমর্থন এবং নিজের পরিচয়

প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হলেও প্রথম দিকে পরিবার তাঁর উদ্যোগকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি। পরে যখন তানভীর পরিবারের সদস্যদের নিজের কাজের ধরন বোঝান এবং তাঁরা দেখতে পান যে তাঁর উদ্যোগ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে। একসময় পরিবারের সদস্যরাও তাঁকে সমর্থন দিতে শুরু করেন।

তবে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এখনো নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয় বলে মনে করেন তানভীর। এসব বাধা সত্ত্বেও নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর কাছে ট্যাটু আর্টিস্ট হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মূলত প্যাশনের জায়গা থেকে আসা। অন্যদিকে তিনি নিজেকে পেশাগতভাবে একজন গ্রাফিক্স ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাঁর ভাষ্যে, স্টুডিও প্রতিষ্ঠার শুরুটা ছিল সম্পূর্ণ শখ থেকে। সেই শখকেই সময়ের সঙ্গে একটি ডিজাইন স্টুডিওতে রূপ দিয়েছেন তিনি।

এই উপলব্ধি তাঁর যাত্রাকে অন্য মাত্রা দেয়। কারণ, সব উদ্যোগের শুরুতেই বড় হওয়ার পরিকল্পনা থাকে না। কখনো কখনো নিজের ভালো লাগার কাজটি নিয়মিত করতে করতেই তৈরি হয় নতুন সম্ভাবনা। তানভীরের ক্ষেত্রেও নিজের হাতে ট্যাটু আঁকার অভ্যাস ধীরে ধীরে একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি তৈরি করেছে। সেই সঙ্গে গ্রাফিক্স ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের অভিজ্ঞতা তাঁর কাজের জগৎকে করেছে আরও বিস্তৃত।

সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন

২০১৮ সালে যে উদ্যোগের শুরু হয়েছিল ছোট পরিসরে, আট বছর পর সেটি তানভীর ইসলামের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সময়ে তিনি কাজের ক্ষেত্র বাড়িয়েছেন, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং নিজের উদ্যোগকে আরও গোছানো রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে তাঁর কাছে এই আট বছর কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি পর্যায়।

ভবিষ্যতে ট্যাটু ডিজাইনের পাশাপাশি লেজার ট্রিটমেন্টের কাজ আরও বিস্তৃত করতে চান তিনি। একই সঙ্গে গ্রাফিক্স ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজকেও এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। নিজের সৃজনশীল দক্ষতাকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান তিনি।

তানভীর ইসলামের গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এর শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। ছোটবেলায় সৃজনশীল কিছু করার ইচ্ছা, নিজের হাতে কলম দিয়ে ট্যাটু আঁকা এবং পরিচিত মানুষের আগ্রহ—এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয়েছে একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি। পথে এসেছে সংশয়, পারিবারিক আপত্তি এবং সামাজিক বাধা। তবু নিজের ভালো লাগার কাজ থেকে সরে যাননি তিনি।

রাজশাহীর ‘Twentythree Tattoo and Design Studio’ তাই কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আট বছরের অভিজ্ঞতা। যে তরুণ একসময় নিজের হাতে নকশা আঁকতেন, তিনি আজ সেই নকশার জগৎকেই নিজের পরিচয়ের অংশ করে তুলেছেন। সামনে তাঁর পথ আরও দীর্ঘ, স্বপ্নও আরও বিস্তৃত। আর সেই স্বপ্নযাত্রার মূল শক্তি হয়ে রয়েছে শৈশবে জন্ম নেওয়া একটি ইচ্ছা—নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে আলাদা কিছু করা এবং নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়া।

ঢাকা রিপোর্টার/দেবযানী
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url