রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি নীলা ইসরাফিলের খোলা চিঠি
![]() |
| রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি নীলা ইসরাফিলের খোলা চিঠি |
রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি নীলা ইসরাফিলের খোলা চিঠি
ডেস্ক রিপোর্টার: অভিনেত্রী ও রাজনৈতিক কর্মী নীলা ইসরাফিল সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফেসবুকে প্রতিনিয়ত সরব ভূমিকা রাখেন। নানান বিষয়েই কথা বলেন বলেন তিনি। এবার সমাজের নানান অনংগতি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দ্বিচারিতাকে ইঙ্গিত করে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। সেখানে শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসাসহ নানান দিককেই তুলে ধরেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুপুর দুইটার দিকে খোলা চিঠিটি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন নীলা ইসরাফিল। পাঠকদের জন্য তার চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
“প্রিয় রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ,
উন্নয়নের গল্প শোনানোর আগে একটি সহজ প্রশ্নের উত্তর দিন আপনার নিজের পরিবার কি সেই বাংলাদেশে বাস করতে প্রস্তুত, যে বাংলাদেশকে আপনি সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি করেছেন?
যেদিন আপনার সন্তানকে উন্নত শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানোর প্রয়োজন হবে না, যেদিন আপনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আপনার সন্তানকে বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন এবং বলবেন এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থাই আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য যথেষ্ট! যেদিন আপনার সন্তান পড়াশোনা শেষ করে বিদেশে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্নের বদলে এই দেশেই চাকরি, ব্যবসা, গবেষণা ও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখবে!
যেদিন আপনি নিজে এবং আপনার পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ হলে বিদেশের হাসপাতালের টিকিট খোঁজার আগে বাংলাদেশের হাসপাতালের ওপর আস্থা রাখবেন! যেদিন একজন সাধারণ নাগরিকও নিশ্চিত হবে যে টাকা, পরিচয়, রাজনৈতিক সুপারিশ কিংবা ক্ষমতার পরিচয় ছাড়াই সে সরকারি হাসপাতালে সম্মানজনক চিকিৎসা পেতে পারে!
যেদিন আপনার সন্তানও সাধারণ মানুষের সন্তানের মতো পাবলিক বাস, ট্রেন বা গণপরিবহনে স্কুল-কলেজে যেতে পারবে এবং আপনি আতঙ্কিত হবেন না! যেদিন একজন বাবা তার মেয়েকে সন্ধ্যার পর একা রাস্তায় বের হতে দিয়ে নিশ্চিন্তে বলতে পারবেন আমার দেশ আমার মেয়ের জন্য নিরাপদ!
যেদিন কোনো মেয়ে প্রভাবশালী পরিবারের পরিচয়, গাড়িবহর, দেহরক্ষী বা বিশেষ প্রোটোকল ছাড়াই সন্ধ্যার পর নিজের কর্মস্থল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবে! যেদিন একজন সাধারণ নাগরিক থানায় গেলে তাকে ঘুষ দিতে হবে না, সরকারি অফিসে কাজ করাতে দালাল লাগবে না, পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে রাজনৈতিক পরিচয় লাগবে না!
যেদিন একজন মেধাবী তরুণ চাকরি পেতে দলীয় পরিচয় নয় যোগ্যতা, সততা ও পরিশ্রমকে তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে! যেদিন ব্যবসা করতে হলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা নয়, স্বচ্ছ নিয়ম ও দক্ষতাই হবে সাফল্যের চাবিকাঠি! যেদিন রাষ্ট্রের সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করার সংস্কৃতি শেষ হবে! যেদিন ক্ষমতাবানদের জন্য এক আইন আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক আইন থাকবে না
সেদিন আপনি জোর গলায় বলতে পারেন আমি সফল সরকার। সেদিন বলতে পারেন আমি সফল নেতা।
কারণ একটি দেশের সাফল্য শুধু পদ্মা সেতু, উড়ালসেতু, মেট্রোরেল, নতুন ভবন কিংবা জিডিপির পরিসংখ্যানে মাপা যায় না। রাষ্ট্রের আসল সাফল্য মাপা হয় মানুষের নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থায়। আজকের বাস্তবতা কিন্তু আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে।
Transparency International Bangladesh-এর ২০২৫ সালের National Household Survey অনুযায়ী, সরকারি ও জনসেবা গ্রহণ করতে গিয়ে ৮১.৬ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে এবং ৬৩.৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে। একই জরিপে ২০২৫ সালে ঘুষ লেনদেনের আনুমানিক মূল্য ১২,৬৩৩.২ কোটি টাকা বলে হিসাব করা হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল কিছু অসৎ কর্মকর্তার সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রের সেবা-ব্যবস্থা, জবাবদিহি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার প্রশ্ন।
প্রশ্ন হলো যে নেতা জনগণের জন্য একটি ব্যবস্থা তৈরি করার দায়িত্ব নিয়েছেন, তিনি নিজে কেন সেই ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারেন না? আর যদি দেশের বর্তমান ব্যবস্থা এতটাই ভালো হয়, তাহলে ক্ষমতাবানদের নিজেদের জীবনে সেই ব্যবস্থার ব্যবহার করতে আপত্তি কোথায়? নেতা সে নয়, যে জনগণকে বলে ‘তোমাদের জন্য ব্যবস্থা আছে।’ নেতা সে, যে এমন ব্যবস্থা তৈরি করে যেখানে নিজের পরিবারকেও সেই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে।
রাষ্ট্র জনগণের। জনগণের করের টাকা দিয়ে নির্মিত হাসপাতাল, রাস্তা, বিশ্ববিদ্যালয়, গণপরিবহন, প্রশাসন সবকিছুর মালিক জনগণই। তাই জনগণের কাছে নেতাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে শুধু নির্বাচনের সময় নয় প্রতিদিন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা নয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান চাই। উন্নয়নের বিজ্ঞাপন নয় মানুষের জীবনে উন্নয়নের প্রমাণ চাই। ক্ষমতার প্রদর্শন নয় জবাবদিহি চাই। বিশেষ সুবিধা নয় সবার জন্য সমান রাষ্ট্র চাই।
আর সবচেয়ে বড় কথা আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে বাঁচতে হবে না। বরং যে বাংলাদেশে ফিরে এসে বাঁচতে ইচ্ছা করবে।
যেদিন বাংলাদেশের একজন নেতা তার সন্তানকে নিয়ে এই দেশের স্কুলে নিশ্চিন্ত থাকবেন, এই দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নেবেন, এই দেশের গণপরিবহনে চলবেন, এই দেশের রাস্তায় তার মেয়েকে নিরাপদে হাঁটতে দেবেন, এই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবিষ্যৎ দেখবেন এবং কোনো বিশেষ ক্ষমতার ছায়া ছাড়াই সাধারণ নাগরিকের মতো জীবনযাপন করতে পারবেন সেদিন আমরা বলব হ্যাঁ, এই রাষ্ট্র সত্যিই বদলেছে।
তার আগে উন্নয়নের গল্প বলা যেতে পারে, পরিসংখ্যান দেখানো যেতে পারে, বিলবোর্ড লাগানো যেতে পারে, সাফল্যের প্রচার করা যেতে পারে। কিন্তু “সফল রাষ্ট্র” দাবি করার আগে রাষ্ট্রকে সাধারণ মানুষের জীবনে সেই সাফল্যের প্রমাণ দিতে হবে। কারণ শেষ বিচারে, সেই বাংলাদেশই আমাদের দরকার। সেই বাংলাদেশ তৈরি করতে পারলে তবেই জোর গলায় বলবেন, “আমি সফল।” তার আগে নয়।”
ঢাকা রিপোর্টার/দেবযানী
