বাদ পড়বেন ৮৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা: বুধবারেই জমা শত শত আবেদন, কাদেরকে রাখা হবে? কারা বাদ পরবেন?
![]() |
| বাদ পড়বেন ৮৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা |
বাদ পড়বেন ৮৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা: বুধবারেই জমা শত শত আবেদন, কাদেরকে রাখা হবে? কারা বাদ পরবেন?
স্টাফ রিপোর্টার: মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে ‘অ-মুক্তিযোদ্ধাদের’ বাদ দিতে চুলচেরা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
বুধবার বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের তালিকা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়নের কৌশল ও করণীয় নির্ধারণে আয়োজিত মতবিনিময় সভা শেষে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি৷
তিন বলেন, ‘দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই করা হবে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় রাখা এবং অ-মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দেওয়ার লক্ষ্যেই এ যাচাই-বাছাই চলছে।’ যদিও সামাজিক মাধ্যমে অনেকের দাবি, বিএনপিপন্থী ও আওয়ামী বিরোধীদেরকে তালিকায় যুক্ত করে আওয়ামীপন্থি মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দেয়ার প্রক্রিয়া এটি।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচকরা অংশ নেন। সভায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা যথাযথভাবে তুলে ধরার বিষয়ে আলোচনা হয়।
মন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত যোদ্ধাদের সঙ্গে অনেক ‘অ-মুক্তিযোদ্ধা’ যুক্ত হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একইভাবে ১৯৭১ সালের শহীদদের তালিকা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার বীরাঙ্গনাদের তালিকা নিয়েও নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। মন্ত্রণালয় এসব বিষয় দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে যাচাই করে সঠিক তথ্য তুলে আনার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, আমরা চাই স্বাধীনতার ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হোক। আগামী দিনে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষ যেন স্বাধীনতার ইতিহাস সঠিকভাবে জানতে পারে। সেই নির্মোহ জায়গা থেকেই কাজ করছে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়।
মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আহমেদ আযম খান বলেন, আজকের মতবিনিময় সভা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ছিল না। এর আগেও এ ধরনের গোলটেবিল বৈঠক হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের মতামত নেওয়া হবে। সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।
নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবেদন নেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নতুন করে আবেদন নেওয়া হচ্ছে না। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও কেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবেদন নেওয়া হবে, সেটি প্রশ্ন। ’ মন্ত্রী এমন কথা বললেও ১ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হয়েছে, বুধবার (৭ অক্টোবর) পর্যন্ত নতুন আবেদন নেওয়া হবে।
সভায় মন্ত্রী বলেন, যারা ইতোমধ্যে আবেদন করেছেন, তাদের আবেদন চুলচেরা যাচাই-বাছাই করা হবে। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কেউ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাদ পড়ে থাকলে তাকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে তালিকায় তারাই থাকবেন, যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ে উত্তীর্ণ হবেন। আগের তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়েও যাচাই-বাছাই চলছে।
তিনি জানান, তালিকায় থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য থেকে বাছাই করে ৮৫ হাজার তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাকে ‘অ-মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করতে চান।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘অ-মুক্তিযোদ্ধা কেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে থাকবে? এটাও স্বাধীনতার ইতিহাসের একটা দায়। সেখান থেকেও আমরা বেরিয়ে আসতে চাই। স্বাধীনতার ইতিহাস বাংলাদেশের পরিচয়ের ইতিহাস। এই ইতিহাসে কোনো মিথ্যা, কলঙ্ক বা দায় যেন না থাকে, সে লক্ষ্যেই কাজ করা হচ্ছে।’
এদিকে, বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্ত হতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ভিড় করেছেন শত শত আবেদনকারী। বুধবার সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত সচিবালয়ের বিপরীতে পরিবহন পুল ভবনে মন্ত্রণালয়ের সামনে ছিল ব্যাপক ভিড়। তবে এদিন মোট কতটি আবেদন জমা পড়েছে, তা জানা যায়নি।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বীর মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদন নেওয়ার প্রক্রিয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই চলছে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) বৈঠকে এসব আবেদনের ভিত্তিতে গেজেটভুক্তির সুপারিশ করা হতো। পরে সেই সুপারিশ অনুযায়ী গেজেট প্রকাশ করত মন্ত্রণালয়।
তবে গত ১ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সারা দেশ থেকে আবেদন জমা দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে ২ অক্টোবর থেকে আবেদনের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বুধবার (৭ অক্টোবর) শেষ দিন হওয়ায় এদিন আবেদনকারীর চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি।
বুধবার বিকেলে মন্ত্রণালয়ের নিচতলায় গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে পুলিশের দুজন সদস্য বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে আবেদন সংগ্রহ করছেন। জমা হওয়া আবেদনগুলো কিছুক্ষণ পরপর ভবনের পঞ্চম তলায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে মন্ত্রীর সুপারিশসংবলিত স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে। পরে আবেদনগুলো আবেদনকারীদের কাছে ফেরত দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা সেগুলো জামুকায় জমা দিচ্ছেন।
পঞ্চম তলায় মন্ত্রীর দপ্তরেও দেখা যায়, আবেদন হাতে নিয়ে অনেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় রয়েছেন। আবেদনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রীর সুপারিশ ছাড়া আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। তাই তাঁরা মন্ত্রীর সুপারিশ নিয়ে আবেদন জামুকায় জমা দিচ্ছেন। মন্ত্রীর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, তাঁর কক্ষে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে মন্ত্রীর দপ্তর থেকে সুপারিশ করা আবেদনগুলো ছেড়ে দেওয়া হবে।
কয়েকটি আবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আবেদনকারীরা নিজেদের বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবি করছেন বটে, কিন্তু তাদের কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন, সেই তথ্য ও প্রমাণপত্র সংযুক্ত করেননি।
ঢাকা রিপোর্টার/দেবযানী
