ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক রহমানের ছবি কি সত্যি এআই?

ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক রহমানের ছবি কি সত্যি এআই?
ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক রহমানের ছবি কি সত্যি এআই?


ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক রহমানের ছবি কি সত্যি এআই?


ডেস্ক রিপোর্টার: শনিবার (৩ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তোলা একটি ছবি প্রকাশ করেন। সেই ছবির ক্যাপশনে তিনি জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়া বিশ্বনেতা ও তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেওয়া সংবর্ধনায় তিনি ও ডা. জুবাইদা রহমান অংশ নিয়েছিলেন।  সেখানে ট্রাম্প আয়োজিত রিসেপশনে (নৈশভোজে) অংশ নেয়ার পর সহধর্মিণীকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে ফ্রেমবন্দী হন তিনি। ছবিটির উৎস হিসেবে হোয়াইট হাউসের নামও উল্লেখ করেন পোস্টে।

ছবিটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অনেকেই ‘ফটো কাটআউট’ বা এআই নির্মিত ছবি বলে দাবি করেন। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও সামাজিক মাধ্যমে এই ছবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

‘ইনফো বাংলা’ নামের একটি ফেসবুক পেজ দাবি করে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ট্রাম্পের ‘ফটো কাটআউটের’ সঙ্গে ছবি তুলেছেন। একই ধরনের দাবি করা হয় আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার পোস্ট ‘কেউ ছবিটি যাচাই করেছেন কি না এবং ফ্যাক্টচেকারদের অবস্থান কী’- তা জানতে চান। অন্যদিকে, মীর জাহান নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিটিকে সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করা হয়। ছবিটি অনুষ্ঠান হওয়ার কয়েকদিন পর প্রকাশের বিষয়টিকেও সন্দেহের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অনলাইনে এমন বিভ্রান্তিমূলক প্রচারনার পর শনিবার রাতেই প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের রিসেপশনে অংশগ্রহণের ওই ছবি পাঠিয়েছে হোয়াইট হাউস। পরে ছবিটি জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়। প্রকাশিত ওই ছবিকে মিথ্যা প্রমাণের চেষ্টা করতে এর সঙ্গে একটি এআই-জেনারেটেড ছবি যুক্ত করে অপপ্রচার চালাচ্ছে অনেকে। এআই-জেনারেটেড ছবিটিতে কসোভোর প্রধানমন্ত্রী আলবিন কুর্তির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ছবি ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে ট্রাম্পকে একটি কার্ডবোর্ডের কাটআউট হিসেবে দেখানো হয়েছে।

তিনি জানান, একশ্রেণির সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের রিসেপশনে অংশগ্রহণের প্রকাশিত ছবিটিকে মিথ্যা দাবি করছে এবং ওই এআই-জেনারেটেড ছবিটিকে সত্য হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে।

আসল ছবিকে কেন এআই নির্মিত বলে দাবি করা হলো?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ছবি প্রকাশের পর সেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি- এমন দাবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ছবিতে ট্রাম্পের দাঁড়ানোর ভঙ্গি ও ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে রাখার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। তবে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের একই ধরনের ছবিগুলো যাচাই করে ট্রাম্পের ছবি তোলার ধরন প্রায় একই দেখা গেছে।  মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার আমন্ত্রিত প্রায় সকল রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে একই ভঙ্গিতে ছবি তুলেছেন।  একই অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলার কারণেই ট্রাম্পের ছবিগুলোতে এতটা মিল রয়েছে। তাই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের অনেকে তারেক রহমানের প্রকাশ করা ছবিটিকে এআই নির্মিত বা কাট আউটের সঙ্গে তোলা ছবি বলে দাবি করেছেন।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আলবেনিয়াভিত্তিক সংবাদ ও বিশ্লেষণধর্মী মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম পামফ্লেটিডটনেট ২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কসোভোর প্রধানমন্ত্রী আলবিন কুর্তির সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথিত ছবিটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে ছবিটি যাচাই করে সেটিকে এআই-জেনারেটেড বা ম্যানিপুলেটেড ছবি হিসেবে প্রমাণ করেছে।

অর্থাৎ, যে ছবিটিকে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে এআই-জেনারেটেড বা ম্যানিপুলেটেড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে সেই ছবিকেই ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের রিসেপশনে অংশগ্রহণের প্রকাশিত ছবিটিকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে কিভাবে প্রমাণিত হলো ছবিটি আসল?

ছবিতে ট্রাম্পের কেই রকম দাঁড়ানোর ভঙ্গি ও ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে রাখার ধরন নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের একই ধরনের ছবিগুলো যাচাই করেছে সংবাদমাধ্যম ও ফ্যাক্টচেকার প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট। তারা বলছে, একাধিক এআই শনাক্তকারী টুলে এসব ছবিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি বা সম্পাদনার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলার কারণেই ট্রাম্পের ছবিগুলোতে এতটা মিল রয়েছে বলে উঠে এসেছে তাদের বিশ্লেষণে।

ট্রাম্পের একই রকম পোজ কেন?

শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তোলা ছবিতেই নয়, কসোভো, আলবেনিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া ও রোমানিয়ার নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের ছবিতেও প্রায় একই ধরনের ভঙ্গি দেখা যায়। সেসব ছবিতেও ট্রাম্পকে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে রাখতে দেখা গেছে।

কসোভোর ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান হিব্রিড ডট ইনফোর পর্যবেক্ষণেও এসব ছবিতে ট্রাম্পের অবস্থান ও অঙ্গভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য মিলের কথা উঠে এসেছে। কসোভোর সংবাদমাধ্যম কোহার এক প্রতিবেদনে এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প নির্দিষ্ট একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং বিভিন্ন দেশের নেতারা একে একে তার পাশে এসে আনুষ্ঠানিক ছবি তোলেন। একই পটভূমি, ক্যামেরার অবস্থান এবং ট্রাম্পের নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে ছবিগুলোতে তার পোজ প্রায় একই রকম দেখা যায়।

কোহা আরও জানিয়েছে, অনুষ্ঠানে হোয়াইট হাউসের নির্দিষ্ট আলোকচিত্র ছাড়া অন্য কারও ছবি তোলার অনুমতি ছিল না। ফলে একই ফটোগ্রাফি প্রক্রিয়ায় একাধিক নেতার ছবি তোলা হয়। তবে ছবিগুলোতে ট্রাম্পের অবস্থান পুরোপুরি অভিন্ন নয়। বিভিন্ন ছবিতে তার বাঁ হাতের অবস্থান, মুখের অভিব্যক্তি ও হাসিতে ছোটখাটো পার্থক্য রয়েছে।

সব ছবিতে কি একই পোজ?

অনুষ্ঠানের অন্য ছবিগুলোতেও ট্রাম্পকে ভিন্ন ভঙ্গিতে দেখা গেছে। কসোভোর ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান হিব্রিড ডট ইনফো জর্জিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইরাকলি কোবাখিদজে এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে তোলা ছবির উদাহরণ দিয়েছে।

শাহবাজ শরিফের সঙ্গে একটি ছবিতে ট্রাম্পকে বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে রাখতে দেখা গেলেও অন্য একটি ছবিতে তাকে করমর্দন করতে দেখা যায়। অর্থাৎ অনুষ্ঠানজুড়ে ট্রাম্পের অঙ্গভঙ্গি একেবারে অপরিবর্তিত ছিল না।

হিব্রিড ডট ইনফোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হাইভ মডারেশন ব্যবহার করে পরীক্ষায় আলোচিত বলকান নেতাদের ছবিগুলোকে এআই-নির্মিত হিসেবে শনাক্ত করা হয়নি।

এ ছাড়া দ্য ডিসেন্ট বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে এসব নেতার ছবি সংগ্রহ করে একাধিক এআই যাচাইয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ছবিগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক ছবিতে একই ধরনের ভঙ্গি নতুন নয়। ২০১৯ সালেও ট্রাম্পের আয়োজিত বিশ্বনেতাদের একটি সংবর্ধনায় তাকে একই ধরনের ভঙ্গিতে ছবি তুলতে দেখা গিয়েছিল। ট্রাম্পের কূটনৈতিক অনুষ্ঠানের ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও ব্যঙ্গের ঘটনাও নতুন নয়। ২০১৭ সালে পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে ট্রাম্পের একটি ছবি প্রকাশের পর পোপের গম্ভীর মুখভঙ্গি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা মন্তব্য ও তুলনা ছড়িয়ে পড়েছিল।

রোমানিয়াতেও একই ধরনের সন্দেহ

ট্রাম্পের সঙ্গে রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুশোর দানের একটি ছবিকে ঘিরেও একই ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। ২ অক্টোবর ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের ও তার সঙ্গী মিরাবেলা গ্রাদিনারুর ছবি প্রকাশ করার পর ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি—এমন দাবি ছড়িয়ে পড়ে। পরে রোমানিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানায়, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি নয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে শুধু হোয়াইট হাউসের অফিসিয়াল আলোকচিত্রীর প্রবেশাধিকার ছিল এবং ছবি প্রক্রিয়াকরণের পর অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিদলের কাছে একসঙ্গে পাঠানো হয়। এ কারণে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর বিভিন্ন দেশের নেতাদের ছবি প্রায় একই সময়ে প্রকাশিত হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।

তাহলে বাংলাদেশের আলোচিত ছবিটি?

বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া ট্রাম্পের ‘কার্ডবোর্ড কাটআউট’-এর ছবিটি অবশ্য আলাদা বিষয়। ফেসবুকে ওই ছবি শেয়ার করে দাবি করা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ট্রাম্পের প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও ছবিটি শেয়ার করে এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিটি মূল ছবি নয়; এটি ওপেনএআই ব্যবহার করে তৈরি করা একটি কৃত্রিম ছবি।

অর্থাৎ, ট্রাম্পের সঙ্গে তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের আসল ছবিতে ট্রাম্পের পোজ অন্য কয়েকটি দেশের নেতার সঙ্গে তোলা ছবির সঙ্গে মিল থাকলেও, শুধু এই মিলকে ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায় না। বরং একই অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে একই ফটোগ্রাফারের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ছবি তোলার কারণেই একাধিক ছবিতে ট্রাম্পকে প্রায় একই ভঙ্গিতে দেখা যাওয়ার ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে।

ঢাকা রিপোর্টার/দেবযানী
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url